ভিজিটিং কার্ড ডিজাইন

mehedi

ডিজাইন জগতে অন্যতম কাজ ভিজিটিং কার্ড ডিজাইন। আজ আমি আপনাদের শিখাবো কিভাবে ভিজিটিং কার্ড ডিজাইন করতে হয় ফটোশপে আর ইলাস্ট্রেটরের মাধ্যমে। তো চলুন শুরু করা যাক।

বিজনেস কার্ড ডিজাইন করার জন্য ইলাস্ট্রেটর এবং ফটোশপ সফটওয়্যার দুটি ব্যবহার করা লাগতে পারে। ইলাস্ট্রেটর দিয়ে মূল ফরম্যাট করে নিতে হবে এবং যেকোনো লেখা আর কোন ছবি মডিফাই করার প্রয়োজন হলে সেটা ফটোশপে করে নিতে হবে। সর্বশেষে ডিজাইনটি যদি ইলাস্ট্রেটরে সেভ করে নিতে পারেন তাহলে কোয়ালিটি ভালো পাওয়া যাবে।

একটি ভিজিটিং কার্ড ডিজাইনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হয়। চলুন জেনে নিই সেই বিষয়গুলো সম্পর্কে>>>

  • ডিজাইনের সঠিক সাইজ নির্বাচনঃ

আমরা অনেকেই বিজনেস কার্ড বা ভিজিটিং কার্ড ডিজাইন করে থাকি। কিন্তু প্রিন্টের কথা মাথায় রাখি না। এই কারণে কার্ডটি প্রিন্ট করতে গিয়ে অনেক সমস্যায় পরতে হয়। যেমন : কার্ডটির কিছু অংশ কাটা পড়ে অর্থাৎ সাইজ ঠিক না থাকায় কার্ডটির গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়।

একটি স্ট্যান্ডার্ড মানের বিজনেস কার্ডের সাইজ হয়ে থাকে, দৈর্ঘ্যে ৩.২৫“ বা ৩.৫“ এবং প্রস্থে ২“।

বিজনেস কার্ড প্রধানত দুই ধরনের হতে পারে, পোট্রেইট এবং ল্যান্ডস্কেপ। যদি ল্যান্ডস্কেপ হয় তাহলে দৈর্ঘ্য ৩.২৫” বা ৩.৫” এবং প্রস্থ ২” হবে আর যদি পোট্রেইট হয় তাহলে উল্টা হবে অর্থাৎ দৈর্ঘ্য ২“ এবং প্রস্থ ৩.২৫” বা ৩.৫” হবে।

এই তো গেলো একটি বিজনেস কার্ড এর প্রকৃত সাইজ কেমন হয় সেই সম্পর্কে ধারনা। এখন যদি এটি প্রিন্ট করতে গিয়ে কোন অংশ কেটে ফেলি তখন কি হবে ! এই জন্য আসল ডিজাইন থেকে কিছু অংশ বাড়তি নেয়া হয়। একে Bleed Size বলে। যেমন : কার্ডটির প্রকৃত সাইজ নেয়া হয়েছে দৈর্ঘ্যে ৩.৫ “ এবং প্রস্থে ২ “। আমরা এক্ষেত্রে Bleed Size নেবো ০.৫” উভয় দিকে। তাহলে কার্ডটির মোট সাইজ হবে, দৈর্ঘ্যে ৩.৫” +০.৫“ = ৪” এবং প্রস্থে ২” + ০.৫” = ২.৫”।

সম্পূর্ন ডিজাইনটি করা থাকে একটি আলাদা বক্সের ভিতরে এবং সেই বক্সটি থাকে Bleed Size এর ভিতরে, ঐ বক্সটিকে বলে ‘Safe Area’। প্রিন্ট করার পর কার্ডটি নিরাপদে কেটে নিতে হবে এবং সেইফ এরিয়ার বাইরের অংশ ফেলে দিতে হবে।

  • রেজুলেশন এবং কালার-মোডঃ

রেজুলেশন হচ্ছে কার্ডটির কোয়ালিটি। কার্ডটি প্রিন্ট করার পর কেমন হবে সেটার অনেকটি অংশ এই রেজুলেশনের উপরেও নির্ভর করবে। এখানে রেজুলেশন প্রিন্টের কথা কল্পনা করে ৩০০ পিপিআই দিতে হবে।

রেজুলেশনের পর এইবার কালার-মোড নির্ধারণ করে নিতে হবে। বেশি পরিচিত কালার মোডের ভিতরে রয়েছে RGB কালার মোড এবং CMYK কালার মোড। ওয়েবের কাজের ক্ষেত্রে RGB (Red, Green, Blue) কালার-মোডটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সব ধরনের রং-কে এই মোডটি শুধুমাত্র তিনটি রং দিয়েই প্রকাশ করে থাকে। আর প্রিন্টিং-এর ক্ষেত্রে CMYK (Cyan, Magenta, Yellow, Black) কালার-মোডটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। একে চার কালারের প্রিন্টিং সিস্টেম বলে থাকে অনেকে।

 

আমাদের বিজনেস কার্ডটি যেহেতু প্রিন্ট করা হবে তাই আমাদের অবশ্যই CMYK কালার-মোডটি ব্যবহার করতে হবে।

  • মূল তথ্যঃ

একটি বিজনেস কার্ডের সব থেকে জরুরী বিষয় হচ্ছে তথ্যসমূহ। এখানে কার্ডের মালিকের এমন কিছু তথ্য দেয়া থাকবে যেগুলো তিনি দিতে চাচ্ছেন এবং তাঁর বিজনেসের জন্য প্রয়োজন। তথ্য ছাড়া কার্ড অচল। এই তথ্যসমূহ সুন্দর করে সাজিয়ে নিতে হবে। শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় বিষয় রাখতে হবে। অযথা অপ্রয়োজনীয় বিষয় রেখে কার্ডটিতে ভরে ফেলা যাবে না।

একটি বিজনেস কার্ডের তথ্যসমূহকে অবশ্যই সাজিয়ে লিখতে হবে। এই লেখাগুলোর জন্য অবশ্যই আমাদের এডোবি ইলাস্ট্রেটর ব্যবহার করতে হবে। কারণ ইলাস্ট্রেটরে লেখাগুলো সুন্দরভাবে ডিজাইন করা যায় যা ফটোশপ দ্বারা সম্ভব না।

আবার প্রিন্টিং এর ক্ষেত্রে লেখাগুলোও ইলাস্ট্রেটরেই করতে হবে। যদি কেউ ফটোশপ ইউজার হয়ে থাকে অর্থাৎ ফটোশপ এর কাজ ইলাস্ট্রেটরের থেকে বেশি করতে পারে, এই ক্ষেত্রে তথ্যগুলো লেখার জন্য প্রথমে ইলাস্ট্রেটর ওপেন করে নিয়ে সকল লেখাগুলো ইলাষ্ট্রেটরে হাই রেজুলেশন (৩০০ পিপিআই) দিয়ে লিখে নিতে হবে তারপর সেগুলো কপি করে নিয়ে পরে এডোবি ফটোশপে বসাতে হবে। তাহলে তুলনামূলকভাবে লেখার কোয়ালিটি ভালো পাওয়া যাবে।

একটি কার্ডে তথ্য লেখার সময় টাইটেল ও ই-মেইল এড্রেস ছোট/সংক্ষিপ্ত করে লেখার চেষ্টা করতে হবে। এমন কোন ফন্ট ব্যবহার করা যাবে না যেগুলো পড়তে কষ্ট হয়। হতে পারে একটি ফন্ট অনেক সুন্দর কিন্তু পড়াই যায় না, তাহলে এ ক্ষেত্রে ফন্টটি এড়িয়ে চলতে হবে।

অর্থাৎ এমন করে একটি বিজনেস কার্ড সাজাতে হবে যেন, কেউ এই বিজনেস কার্ডটি নিলে পরবর্তীতে সেটা মনে রাখতে পারে।

  • ক্রিয়েটিভিটিঃ

একটি বিজনেস কার্ড বা ভিজিটিং কার্ড তার মালিকের পরিচয় বলতে পারে। তাই একে সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে হবে। কমবেশি অনেক ডিজাইনাররা একটি কার্ড ডিজাইনের সময় ক্রিয়েটিভিটির দিকে নজর রাখে। তাই একটি কার্ড তৈরির সময় চেষ্টা করতে হবে ভিন্ন রূপ দিয়ে নতুন ডিজাইন করার। আর এটা দেখে যেন অন্য কারো আইডিয়া থেকে কপি করা যেন মনে না হয়। দেখলেই যেন বোঝা যায় এটা আপনার দ্বারা ডিজাইন করা। আইডিয়ার জন্য আশেপাশের ডিজাইনের দিকে নজর রাখতে হবে। বিজনেস কার্ড ল্যান্ডস্কেপ অথবা পোট্রেইট হতে পারে আবার সিঙ্গেল সাইড বা ডাবল সাইডেড হতে পারে।

  • প্রিন্টিংঃ

অনেকের কাছে প্রিন্টিং একটি কঠিন কাজ মনে হয়। তারা জানে না প্রিন্টিং জন্য মুল ফাইলটিকে কি ফরম্যাটে সেইভ দিতে হবে। কেউ কেউ নরমাল JPG ফরম্যাটে দিয়ে থাকে। এতে করে কোয়ালিটি ভালো পাওয়া যায় না। অনেক সময় PDF ফরম্যাটে প্রিন্ট দেয়া যেতে পারে। তবে ইলাস্ট্রেটর থেকেও সরাসরি প্রিন্ট করা যেতে পারে। এটাই বেস্ট।এছাড়াও …

রঙিন ছবিকে সাদাকালো করা : ছবিকেছবি ব্যবহার করা হলে অবশ্যই সেটা ‘এডোবি ফটোশপ’ ব্যবহার করে কারেকশন করে নিতে হবে। ফটোকে সাদাকালো করার জন্য ‘IMAGE > ADJUST > DESATURATE’ ব্যবহার না করে অবশ্যই ‘IMAGE > ADJUST > CHANNEL MIXER’ ব্যবহার করতে হবে। এছাড়াও ‘MONOCHROME’ চেকবক্সটিকে সিলেক্ট করে নিতে হবে।

 

Rich Black & 100% Black : অনেক সময় আমরা কালো রঙ তৈরির ক্ষেত্রে (C=0, M=0, Y=0, K=100) দিয়ে থাকি, এটা ১০০% Black। এটা না করে যদি আমরা (C=90,M=60,Y=30,K=100) দেই তাহলে আরও বেটার লাগবে দেখতে। এটাকে ‘Rich Black’ কলে। আমাদের Rich Black ব্যবহার করতে হবে ১০০% Black এর পরিবর্তে। এটাই অনেক সময় দেখতে ভালো হবে।

প্রিন্টিং এর কথা খেয়াল করে ডিজাইন করলে ডিজাইন করার পূর্বেই ফটোকে ফটোশপে Image > Mode > CMYK করে নিতে হবে। ডিফল্ট অবস্থায় সেখানে RGB সিলেক্ট করা থাকে। এইবার সেই ফটোটার কাজ করা শেষ হয়ে গেলে সেইভ দিতে হবে হাই-কোয়ালিটি JPG বা PNG ফরম্যাটে। এবং ইলাস্ট্রেটর ওপেন করে File > Place ব্যবহার করে ছবিটি বসাতে হবে। ফটোশপ থেকে কপি করে ইলাস্ট্রেটরে ছবিটি নেয়া যাবে তবে এটা করা ঠিক হবে না।মেইন ফোল্ডারটির নাম হবে প্রোজেক্টের নাম দিয়ে এবং বাকি সব কিছুই তার ভিতরে রাখতে হবে। যেমন : কাজটি করতে গিয়ে যে সকল ফন্ট ব্যবহার করা হয়েছে তার একটি সংগ্রহ রাখতে হবে Fonts নামক ফোল্ডারটির ভিতরে, ইমেজ/ফটো/ছবি ব্যবহার করা হলে সেগুলো থাকবে Images ফোল্ডারটির ভিতরে এবং একটি থাকলে প্রধান ফাইল যা হতে পারে ‘ইলাস্ট্রেটর’ ফাইল ‘.AI’ ফরম্যাটের ফাইল। এর সাথে অতিরিক্ত থাকতে পারে, একটি ‘.JPG’ ফরম্যাটের, একটি ‘.PNG’ ফরম্যাটের এবং আরেকটি ‘.PDF’ ফরম্যাটের ফাইল। ব্যাস কাজ শেষ। এই সেটটি এখন সিডি/ডিভিডিতে রাইট করে বা পেনড্রাইভে বা অন্যকোনভাবে পাঠিয়ে দিতে হবে প্রিন্টিং এরিয়াতে প্রিন্ট করার জন্য।

চলুন এখন জেনে নিই DPI এবং PPI সম্পর্কে। অর্থাৎ DPI এবং PPI এর কাজ কি জেনে নিই।

DPI এবং PPI:

অনেক সময় আমরা ফাইলের ক্ষেত্রে বলি ৩০০ dpi দিয়ে কাজটি করা হয়েছে, কিন্তু এটা ভুল। এখানে dpi হবে না, হবে ppi । ‘dpi’ হচ্ছে ‘Dot Per Inch’ আর ‘ppi’ হচ্ছে ‘Pixels Per Inch’। ‘dpi’ (Dot Per Inch) ব্যবহার করা হয় printer, monitor ইত্যাদি হার্ডওয়্যার এর ক্ষেত্রে কোন ডিজিটাল ফাইলের ক্ষেত্রে নয়। Digital ফাইলের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয় ‘ppi’ (Pixels Per Inch)। ডিজিটাল ফাইল বলতে ফটোকে বুঝানো হয়েছে।

কার্ড ডিজাইন করা শিখে গেলেন। এবার ডিজাইনকে চমকপ্রদ করে তোলার পালা। কিন্তু কথা হলো কেমন করে আপনি আপনার ডিজাইনকৃত কার্ড চমকপ্রদ করে তুলবেন? এর উত্তর হল মোকআপ-এর দ্বারা আপনি আপনার ডিজাইনকে অনেক সুন্দর করে তুলতে পারবেন। আসুন জেনে নিই মোকআপ সম্পর্কে>>>

মোকআপ কি?

মোকআপ হচ্ছে আপনি যে ডিজাইনটি করবেন সেটা ফাইনাল করার আগে একটি ডেমো ডিজাইন করা। মনে করি আমাদের এই বিজনেস কার্ডটি ডিজাইন করার পর এখন প্রিন্ট করবো কিন্তু তার আগে ডিজাইনটি যিনি করতে দিয়েছেন তাকে একবার দেখিয়ে নিতে হবে, এর জন্য একটি মোকআপ তৈরি করে তাকে দেখাতে হবে। মোকআপ দেখে খুশি হলেই তবে মুল ডিজাইনটি প্রিন্ট করতে পাঠাতে হবে। মোকআপ বিভিন্নভাবে সাজিয়ে নেয়া যায়। বিভিন্নভাবে সাজিয়ে সাজিয়ে দেখা যেতে পারে মুল ডিজাইনটি কেমন হয়েছে। যেমন : আমাদের বিজনেস কার্ডটি প্রিন্ট করার পর সেটি একত্রে অনেকগুলি একটি টেবিলের উপরে রাখলে দেখতে কেমন হবে, অথবা কার্ডগুলো টেবিলে ছড়িয়ে রাখলে কেমন দেখাবে ইত্যাদি।

অনেক ধরনের প্রি-মেড মোকআপ ডিজাইন পাওয়া যায়, যা মডিফাই করার যোগ্য। সেগুলো সংগ্রহ করে আমাদের মুল কাজটি সেখানে সাবমিট করে দিতে পারলেই মোকআপ ডিজাইন হয়ে যাবে।

আশা করি আমার লেখা আপনাদের অনেক কাজে দিবে। আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। আগামী দিনে আপনাদের জন্য ভালো কিছু নিয়ে লেখার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ্‌।

No comments

Theme images by Deejpilot. Powered by Blogger.